“For character building, and citizenship, my parents prepared me to qualify for the Gurukul, (Someone once called it the Eaton of India). Lifelong gratitude to my parents for motivating, guiding and sponsoring the opportunity for me ”

জীবনের দ্বিতীয় অধ্যায়

সেদিন হঠাৎ আমার দশ বছরের ছেলে প্রশ্ন করল, “বাবা তোমার হোস্টেল লাইফ কেমন ছিল?এ সি ছিল?ক্যান্টিন?তোমার ভাল লাগত স্কুলে?”

একটু কথাবার্তার পর জানলাম তার কোনও বন্ধু অন্য স্কুলে ‘ফারদার স্টাডির’ জন্য হস্টেলে যাচ্ছে,তাই তার ছোট্ট মনে এত কিছু জিজ্ঞাসা।

আমার গায়ে হেলান দিয়ে বেশ মন দিয়ে সে শুনতে লাগল আমার পুরুলিয়া রাম কৃষ্ণ মিশনের গল্প।আর আমিও যেন সেই ছোটো বেলায় ফিরে গেলাম নিমেষে।

The School

Image Credit: RKMVP

যাত্রা শুরু…

১৯৮৮ -৮৯ সাল,জানুয়ারি মাস।আসানসোলের St.Vincent’s High and Technical School এর পাঠ চুকিয়ে, বাবার সাথে রওনা দিলাম পুরুলিয়ার উদ্দেশ্যে।খুব কান্না পাচ্ছিল মা,ভাই,বন্ধুদের ছেড়ে যেতে।সারা ট্রেন বাবা অল্প স্বল্প কথা বলছিলেন।তাদের ও যে মন খারাপ সেটা সেদিন বোঝার মানসিকতা আমার ছিলনা।পুরুলিয়া স্টেশনে নেমে মাল-পত্র নিয়ে বাবা আর আমি উঠলাম এক রিকশাতে। আকাশে রোদ ঝলমল, চারিদিকে শুষ্ক একটা হাওয়া; রাস্তা গুলো লাল মাটির।খুব একটা  গাছপালা চোখে পড়ল না।মনে মনে পুরানো স্কুল- শিক্ষক – সহপাঠী দের মিস করতে লাগলাম। একটু ভয় একটু শঙ্কা ছিল এই নতুন স্কুল এর ব্যাপারে।এক সুবিশাল গেটের কাছে রিক্সা থামল।

বাবা দেখালেন গেটে লেখা আছে-উত্তিষ্ঠত জাগ্রত পাপ্য বরান নিবোধত-

উপনিষদের এই বানীর অর্থ তিনি বললেন -“ওঠো,জাগো এবং জ্ঞান শ্রেষ্ঠ পুরুষদের সান্নিধ্যে জ্ঞান লাভ করো”।সত্যি বলতে গূঢ়ার্থ কিছুই বুঝিনি ঐ মন খারাপের দিনে।তবে আজ সহজেই উপলব্ধি করতে পারি এর অর্থ।

যায় হোক, একশ একরের  চ্যারিটেবল ট্রাস্ট রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যাপীঠ এর চত্বরে যখন পা রাখলাম  আমার মন এবং মস্তিষ্ক থেকে পুরুলিয়ার রুক্ষ শুষ্ক মানচিত্র একটু একটু করে মুছে যাচ্ছিল।

পুরাকালে গুরুগৃহে থেকে যেমন শিক্ষালাভের ব্যবস্থা ছিল;  আমাদের বিদ্যানিকেতনটিও তেমনি একটি সুপরিকল্পিত গুরুকুলের আধুনিক নিদর্শন।আমরা আমাদের “গৈরিক বসন পরিহিত শিক্ষাগুরুদের”- ‘মহারাজ’ বলে সম্বোধন করতাম। তাদের  কঠোর তত্ত্বাবধান,তাদের স্নেহ জড়ানো আদর-আপ্যায়ন; অন্যদিকে স্কুলের গথিক-মায়ান-পাঠান ভাস্কর্যের সংমিশ্রণে তৈরি অদ্ভুত অথচ ইউনিক আর্কিটেকচার;চারিপাশের(বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের বট, ডুমুর, আমলকী, অর্জুন,অশ্বত্থ   গাছের সমন্বয়,বিভিন্ন মরশুমি ফুলের বাহা‌র, নানান ধরনের পাখিদের কলকাকলি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন উদ্যানবাটিকা ইত্যাদি)সুন্দর পরিবেশ এবং বন্ধু- সিনিয়র জুনিয়র সব মিলিয়ে একদিন দেখলাম দিব্যি ৭/৮ বছর কেটে গিয়েছিল আনন্দে।

স্কুলের রোজনামচা

Early to bed and early to rise / makes a man healthy wealthy and wise……এই মন্ত্র মেনে প্রতিদিন ভোর 5 টা 45 এ ঘুম ভাঙ্গানিয়া ঘণ্টা দিয়ে দিনের শুরু হতো,তা সে যে কোন ঋতুই হোক।যেহেতু এটি আবাসিক বিদ্যালয় ছিল,তাই ধনি দরিদ্র বা কাছে দুরের সব ছাত্রকেই হস্টেলে থেকে পড়াশোনা করতে হত।আমরা একই ক্লাসের ছাত্ররা একসঙ্গে থাকতাম। দৈনন্দিন কাজগুলি-যেমন বিছানা পরিষ্কার,ঘর দোর গোছানো,ঝাঁট মোছা ইত্যাদি  করার জন্যে কয়েকটি দলে আমাদের ভাগ করে দেওয়া হত;আমাদের সাহায্যের জন্যে সিনিয়ররা থাকতেন। আর সবার উপরে মহারাজরা সিদ্ধান্ত নিতেন কারা ভাল কাজ করেছে এবং সেই মতো আমাদের উৎসাহ দেবার জন্যে পুরস্কারও দেওয়া হত।আর এইসব কাজ রোটেশন করে সবার কাছেই আসত।বিছানার চাদর কতখানি দৈর্ঘ্যে প্রস্থে থাকা উচিৎ থেকে স্কুলের সমস্ত কাজের তালিম বেশ মিলিটারি নিয়মেই দেওয়া হতো ।

এর পর  প্রার্থনা সঙ্গীত এবং ছোলা-গুড় খেয়ে টানা 2 ঘণ্টা কসরত।তারপর স্নান সেরে পরিষ্কার ধুতি পাঞ্জাবি পরে খাবার খেয়ে স্কুলের এসেম্বলিতে যোগদান।এখনও মনে আছে সেই গান-‘বিদ্যাপীঠের প্রতুলতা মুগ্ধ করে মন’.. ।এরপর শুরু হতো পড়াশোনা।মাঝে লাঞ্চ ব্রেক তারপর ঠিক 4 টেই পড়া শেষ। আমরা বিকেলের খেলার সময়টার জন্য সকলে মুখিয়ে থাকতাম।বিশাল বিশাল ইউক্যালিপটাসের সারি সুপ্রসারিত খেলার মাঠটিকে যেন একটা লক্ষণ রেখার মতো ঘিরে রেখেছিল।আমাদের কাছে যেটা অলঙ্ঘনীয় ছিল চিরকাল।

এই প্রসঙ্গে মনে আছে ,আমার এক বন্ধু একবার বাড়ির জন্যে খুব মন খারাপ করায় অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই কীভাবে যেন ঐ লক্ষণ রেখা পার করে পালানর চেষ্টা করেছিল।কিন্তু না ছিল টাকা,না ছিল বাড়ির রাস্তা চেনা।আর সর্বোপরি স্কুলের ইউনিফর্মে থাকায় আশপাশের গ্রামের  লোকজন তাকে আবার স্কুলে মহারাজদের কাছে পৌঁছে দিয়ে যান।ভয়ে ভয়ে ভাবছিলাম ‘না জানি কি শাস্তি অপেক্ষা করছে তার জন্যে’।কিন্তু দেখলাম মহারাজরা ঘটনা টাকে ভীষণ স্বাভাবিক ভাবে নিলেন এবং তাকে বিশেষ কিছুই বললেন না । বরং আরও বন্ধুর মতো মিশে গিয়ে তার মন খারাপটাকে যেন পলকে গায়েব করে দিয়েছিলেন।

Health is wealth…..

আমার বেশ মনে আছেস্কুলের বেশ বড়সড় জিম্নাসিয়ামের কথা।সেখানে যোগব্যায়াম করার,মুগুর ভাজার ব্যবস্থা এবং আরো কত রকমের সরঞ্জাম রাখা শরীরচর্চার জন্যে।এর মেন এন্ট্রান্সের, দেয়ালের গায়ে  গন্ধমাদন পর্বতহাতে হনুমানজির একটা  অবয়ব আছে।মহারাজরা বলতেন ‘ওরে- মহাবীর হনুমানকে যেমন মনে করিয়ে দিতে হতো তার মধ্যে কি অদ্ভুত শক্তি নিহিত আছে- ঠিক তেমনি তোদেরও সুপ্ত প্রতিভা এবং শক্তি আছে সেটা আমাদেরকে ধরিয়ে দিতে হয়। যাতে বড় হয়ে মহাবলী হনুমানের মত তেজীয়ান, বলীয়ান, নিষ্ঠাবান, এবং দৃঢ় প্রত্যয়ী একজন বীর পুরুষ হয়ে উঠতে পারিস- এককথায় সত্যিকারের জেন্টলম্যান’।

 

 প্রসঙ্গত বলি,ছোট্ট বেলায় কেউ হনুমান বা বাঁদর বললে ভীষণ খারাপ লাগত। কিন্তু যখন স্কুলের জিম্নাসিয়ামে হনুমানজির অবয়ব দেখলাম এবং তার মাহাত্ম্য জানলাম তখন থেকে হনুমান বললে কোন নেগেটিভ চিন্তা মনের মধ্যে আসত না।এক কথায় বললে- Positive Thinking মিশনে  মহারাজরা এই পজিটিভ থিংকিং এর মেইন কারেন্ট টা আমাদের মত যুব-ছাত্রদের মধ্যে চালিত করে দিয়েছিলেন শিক্ষা, সংগীত, সাহিত্য, জ্ঞান, কর্ম, ভক্তি, যোগ, শরীর চর্চা এরকম নানান মাধ্যমে যার সুফল আমরা আজও পেয়ে চলেছি।

 

আমাদের স্কুলের ভেতরে ছিল একটি Charitable Hospital ।তাই খেলতে গিয়ে লাগলে বা অসুস্থ হলে ডাক্তার বদ্যি নিয়ে ছিলনা কোনও দুশ্চিন্তা।সেখানে শুধু রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র,শিক্ষক বা সদস্যদেরই নয়; আশেপাশের গ্রাম গঞ্জের আর্ত পীড়িত মানুষদেরও চিকিৎসা করা হতো বিনা পয়সায় ।

চারিত্রিক বিকাশ

পড়াশোনা ,খেলাধুলার পাশাপাশি আমার স্কুলের বাগানের কাজ করতেও খুব ভাল লাগত।সমস্ত বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ নিয়ম করে সকলে মিলে ভাগাভাগি করে পরিষ্কার করা, গাছ লাগানো, গাছে জল দেওয়ার কাজও আমরাই করতাম।‘টীম ওয়ার্ক, বোধ হয় এভাবেই শিখেছিলাম।গাছ লাগানোর মধ্যে দিয়ে শুধু পরিবেশ সচেতনতায় নয় শিখেছিলাম উদ্ভিদ বিজ্ঞানের অনেক কিছু। তাই সালোকসংশ্লেষের সংজ্ঞা আজও বলতে পারি অনায়াসেই।

 

 ‘নিজেদের জামা কাপড় থেকে শুরু করে  পারিপার্শ্বিক সবকিছু যেন ঝকঝকে তকতকে থাকে’-এটা ছিল মহারাজের কঠোর আদেশ। খুব ভয়ে ভয়ে থাকতাম। কিন্তু একটু ভয় আর অনেকটা শেখার ইচ্ছা থেকে অজান্তেই নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায়,Cleanliness means Godliness এগুলি শিখে ফেলেছিলাম। মহারাজেরা বলতেন ‘জাতি-ধর্ম-বর্ণ বাদ দিয়ে শুধু মানুষকে ভালোবাসা এবং কর্মে বিশ্বাস করা এই যেন লক্ষ্য হয়। আর,সেই  লক্ষ্যে স্থির থেকে,  দেশ ও দশের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করায় হল জীবনের মূল আদর্শ’।এমনিভাবেই এই ছোট ছোট কিন্তু ভীষণ দরকারি ব্যাপার গুলো আমার চরিত্রে গেঁথে গিয়েছিলো সেই স্কুল জীবন থেকেই। আজ পরিণত বয়সে এসে যেটা আমি সহজেই উপলব্ধি করতে পারি এবং আমার ছেলেকেও  শেখানোর  চেষ্টা করি।

 

 

আমার খুব আনন্দ হতো স্কুলের ভেতরে ছোট্টখাট্টো চিড়িয়াখানা দেখে। সেখানে ভারতের জাতীয় পশু বাঘ বাদ দিয়ে মোটামুটি সমস্ত জাতীয় চিহ্নগুলি খেলাচ্ছলে শিখে ফেলেছিলাম।মাঝে মাঝে অতি উৎসাহের সাথে পশুপাখিদের খেতে দেওয়া ও তাদের যত্ন করার কাজে আমরাও অন্যদের সাহায্য করতাম ।

 

‘যুব-শক্তি দেশের তথা সভ্যতার মেরুদণ্ড’-এমনটাই মনে করা হতো; তাই আমাদের পুষ্টি-গত খাদ্য জোগানের জন্যে স্কুলে একটি গোশালা, পোল্ট্রি ফার্ম এবং কৃত্রিম জলাশয়ে মাছ চাষও করা হতো।  এছাড়া  ফলমূল শাকসবজির বাগানও ছিল আলাদা ভাবে।

মানসিক পরিস্ফুরন

জীব বিজ্ঞানের বৈজ্ঞানিক নামকরণ মুখস্থ করা একটা দুরূহ ব্যাপার ছিল।একদিন মজা করে মহারাজ বললেন “ওরে ম্যাকাকা মূলেটা( বানরের বিজ্ঞান সম্মত নাম)এ আর এমন শক্ত কি?”। সেই থেকে দুষ্টুমির ছলে বন্ধুদের ‘বোভীশ ইন্দিকাস’ (গোরুর বিজ্ঞান সম্মত নাম)বা ‘রানা টিগ্রিনা’(ব্যাঙের বিজ্ঞান সম্মতও নাম) এসব সম্বোধনে (এবং অবশ্যই গোপনে )আমরা পড়ে ফেললাম জীবন বিজ্ঞানের একটি পুরো অধ্যায়।

 

আজকাল ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর ওপর ভীষণরকম জোর দেওয়া হয় যা নিঃসন্দেহে খুব ভালো। আমাদের সময়ও হাতে লিখে এঁকে  আমরা মহারাজদের  তত্বাবধানে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম।এ প্রসঙ্গে ‘পাচুদা’ কে আজও বেশ মনে আছে। আমি যখন ক্লাস ৬/৭ , তখন তিনি বয়স ৫০/৫৫ হবেন। কি ভীষণ সুন্দর ছিল তার আঁকার হাত।আমি তার কাছে অনেক কিছু শিখেছি।তখন ওয়াল ম্যাগাজিনে আমার আঁকা ছিল এক চেটীয়া। দীর্ঘ ২৫/৩০ বছর পরেও যখন আমার স্কুলের বন্ধুরা কখনও ,পুরানো স্মৃতির জেরে আমায় জিজ্ঞাসা করে “ কিরে এখনও ছবি- টবি আঁকিস তো?” শুনে বেশ আপ্লুত হই।

 

To Be Continued…  Please share your comments below…